Thursday, August 11, 2022
Homeইতিহাসকাগজ আবিষ্কার করেন কে? পৃথিবীতে প্রথম কাগজ তৈরির মেশিন আবিষ্কার 1798

কাগজ আবিষ্কার করেন কে? পৃথিবীতে প্রথম কাগজ তৈরির মেশিন আবিষ্কার 1798

কাগজ আবিষ্কার করেন কে? পৃথিবীতে কাগজ ব্যবহারের ইতিহাস

কাগজ এমন এক বস্তু যার ব্যবহার সারা বিশ্বজুড়ে করা হয়। কিন্তু ‘কাগজ প্রথম কে আবিষ্কার করেছিল? কিভাবে কাগজ তৈরি করা হয় এবং ভারতে কবে কাগজ তৈরি শুরু হয়?‘ এরকম বেশ কয়েকটি প্রশ্ন অনেকেরই মনে আসে।

বাচ্চাদের পড়াশোনা থেকে শুরু করে সমস্ত কর্ম ক্ষেত্রে কাগজের ভূমিকা অপরিহার্য। মূলত ঘাস বাঁশ কাঠ এবং সেলুলোজ জাতীয় কাঁচামাল থেকে কাগজ তৈরি করা হয়ে থাকে। কাগজের আবিষ্কারক দেশ বললে চীনের কথা বলা যায়। কারন সবার আগে চীনে কাগজের ব্যবহার করা হয়েছিল কাগজের আবিষ্কারকের নাম হল কাই লুন। তিনি চীনের অধিবাসী ছিলেন।

পরবর্তীতে কাগজ আবিষ্কার ও ইসলামী বিশ্ব হয়ে ইউরোপ পর্যন্ত তা পৌছানো শুধুমাত্র তথ্যবিস্তৃতিকেই ব্যাপক করে নি বরং সৃজনশীলতার চর্চায়ও অনবদ্য ভূমিকা রেখেছে। আজকের লেখাটি ইসলামী শাসনামল ও তার সমসাময়িক যুগে কাগজের বিস্তৃতি ও প্রভাব নিয়ে।

চীনে প্রথম কাগজ আবিষ্কার

খ্রিস্টপূর্ব ২০০ বছর আগে হান রাজবংশের আমলে কাই লুন কাগজের আবিষ্কার করেন। কাই লুনের কাগজ আবিষ্কারের পূর্বে বাঁশ অথবা রেশমের কাপড়ের উপর লেখা হতো। তবে এই দুটি পদ্ধতিতে দুটি সমস্যা ছিল। রেশম দামি বস্তু ছিল তাই এতে খরচ এর মাত্রা বেশি হতো। অন্যদিকে বাঁশ ভারী হওয়ার সমস্যায় পড়তে হতো। তাই সেই সময় কাই লুন লেখার জন্য এমন বস্তু নির্মাণ করার কথা ভেবেছিল যা হালকা ও পাতলা হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বেশ সস্তাও হবে। তাই ওই সময় তিনি ভাং, তুঁত, গাছের ছাল ও অন্যান্য কিছু পদার্থের সাহায্যে কাগজ নির্মাণ করেছিলেন। তিনি যে কাগজ সেই সময় তৈরি করেছিলেন সেগুলো বেশ চকচকে, কোমল ও মসৃণ হতো। এরপর থেকে ধীরে ধীরে কাগজের ব্যবহার সারাবিশ্বে ছড়াতে শুরু করে।

প্রথমদিকে চীনে কাগজ বানানোর জন্য নানারকম গাছপালা ব্যবহার করা হতো। গাছপালার থেকে সংগ্রহ করা কাঁচামাল জলের সাথে মিশিয়ে এক রকম ঘন তরল পদার্থ বানানো হতো। এরপর তার মধ্যে ডুবিয়ে তা তুলে নিয়ে রোদে শুকাতে দেওয়া হতো। নানা রকমের উদ্ভিদ এর সাহায্যে আলাদা আলাদা মানের কাগজ তৈরি করা হতো। এই সময় থেকেই আরো নানা পদ্ধতি ব্যবহার শুরু হয়েছিল। কাগজ আবিষ্কারের পর চীন কাগজ তৈরির পদ্ধতি গোপন করে রেখেছিল। তাই বহু সময় পর্যন্ত শুধুমাত্র এই কাগজ তৈরি ও ব্যবহার করা হতো।

আরও পড়ুন  সুলতান জালালুউদ্দিন মুহম্মদ শাহ

ভারতের প্রথম কাগজ মিল

ভারতের প্রথম কাগজ সপ্তম শতাব্দীর দিকে তৈরি হলেও এর চাহিদা বাড়তে শুরু করেছিল দ্বাদশ শতাব্দীতে। ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের শ্রীরামপুরে ১৮১২ সালে প্রথম পেপার মিল তৈরি করা হয়েছিল। কিন্তু সেই সময় কাগজের চাহিদাগত সমস্যার কারণে সেটি বন্ধ হয়েছিল। এরপর ১৮৭০ সালে আবার নতুন করে কলকাতার নিকটে বালিগঞ্জে কাগজের কারখানা তৈরি করা হয়। বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গ ভারতের প্রধান কাগজ উৎপাদনকারী রাজ্য হিসেবে গণ্য। ভারতের প্রথম কাগজের মিলটি ১০০ বছর পুরনো।

আমেরিকাতে কাগজের ব্যবহার শুরু

আমেরিকার ফিলাডেলফিয়া তে কাগজ নির্মাণের কাজ শুরু হয় ১৬৯০ তে। ১৮৩০ এর সময় চার্লস ফেনেরটি এবং ফ্রেডরিক গোটলব কেলার কাগজ তৈরির জন্য নতুন পদ্ধতি অবলম্বন করেন। তারা এমন একটি যন্ত্র তৈরি করেছিলেন যার মধ্যে কাঠ থেকে তন্তু আলাদা করা যেত। সেই তন্তু দিয়ে কাগজ তৈরি করতেন। তন্তু শুদ্ধিকরণ করে চার্লস ফেনেরটি সাদা কাগজ নির্মাণের পদ্ধতি বের করেন। বর্তমানে কাগজের গুণগতমান অনেক উন্নত হয়েছে এবং উন্নত মানের সঙ্গে এটি বেশ সস্তা হয়েছে। আর কাগজ সারাবিশ্বে রোজ প্রচুর ব্যবহার হচ্ছে।

কাগজ আবিষ্কার এবং কাগজ ব্যবহারের ইতিহাস

ইসলামি ইতিহাসে কাগজের ব্যবহার

প্রাচীন মুসলিম সাম্রাজ্যে একটা সময় মানুষ যখনই রাস্তায় বা মাটিতে কোথাও কাগজ দেখতে পেত, তখন তা মাটি থেকে তুলে নিত এবং সম্মানের সাথে দরজায় ঝুলিয়ে রাখত। এর কারণ ছিল মুসলিম বিশ্বে দীর্ঘদিন ধরে কাগজ একটি সম্মানিত ও পবিত্র বস্তু হিসেবে গণ্য করা হওয়া। পবিত্র কোরআন ও রাষ্ট্রীয় আইনকানুন লেখার ও আদান-প্রদানের প্রধান মাধ্যম হওয়াই ছিল এর কারণ।

মিশরের প্যাপিরাসের ইতিহাস একপাশে রেখে বললে, আমরা বর্তমানে যে কাগজ ব্যবহার করি, তা হলো মূলত চীনা উদ্ভাবন। প্রাচীন চীনারা ঘাস দিয়ে কাগজ তৈরি করে তা দিয়ে লিখত। কাই লুন নামক এক অফিসার ১০৫ খ্রিস্টপূর্বাব্দে তুঁতগাছের বাকল, শন ও কাপড়ের টুকরা একসাথে মিশিয়ে পিষে আধুনিক কাগজ তৈরি করেন।

আরও পড়ুন  বিজ্ঞানী আর্কিমিডিস কি কি কাজের জন্য বিখ্যাত? আর্কিমিডিস কেনো নগ্ন হয়ে দৌড়ে ছিলেন?

ভারতীয়রা লিখার জন্য সাদা সিল্কের টুকরা ব্যবহার করত যেখানে পারস্যবাসীরা ব্যবহার করত মহিষ, বাছুর বা ভেড়ার চামড়া। পরবর্তীতে আরবরা পারসিকদের কাছ থেকে লেখার উপকরণ তৈরির কলাকৌশল আয়ত্ত্ব করে।

হযরত মুহাম্মদ(সাঃ) এর যামানায় দৈনিক লেখালেখি সাধারণত খেজুর বা তালগাছের আশঁ-ফলক ব্যবহার করেই হতো, উনি তিনি কূটনৈতিক চিঠি ও সন্ধিচুক্তি সম্পাদনের জন্য পশুর চামড়া ব্যবহার করতেন। রাসূল(সাঃ) এর মৃত্যুর পর আবু বকর(রাঃ) এর যামানায় কোরআনকে হরিণের চামড়ায় লিখে সংরক্ষণ করা হয়, এবং এভাবেই উসমান(রাঃ) এর নিকটে এসে পৌছায়।

তখনও বাস্তব অর্থে কাগজ ছিল, কিন্তু তা ছিল খুবই দুষ্প্রাপ্য ও মূল্যবান। হযরত উমর(রাঃ) এর যামানায় মাঝেমধ্যে মুদ্রার পরিবর্তে কাগজ দিয়ে ব্যবসা বাণিজ্য করা হতো, যদিও তাতে কিছু ছাপা থাকত না। প্রথম ছাপা টাকার প্রচলন হয় ত্রয়োদশ শতাব্দীতে, মঙ্গোল শাসক কুবলাই খানের হাত ধরে।

যদিও কাগজ উদ্ভাবন হয়েছে চীনাদের হাতে, কিন্তু এর বিকাশ ঘটেছে মুসলিমদের দ্বারা। ৬৫০ খ্রিস্টাব্দে বুখারা ও সমরকন্দে সর্বপ্রথম সিল্ক দিয়ে কাগজের প্রচলন শুরু হয়৷ ৭০৬ খ্রিস্টাব্দে হিজাযে “দিমাশকি” নামক নতুন কাগজের প্রচলন হয়, যাতে সিল্কের বদলে তুলা ব্যবহার করা হতো।

কাগজ আবিষ্কার এবং কাগজ ব্যবহারের ইতিহাস

৭৫১ খ্রিস্টাব্দে যখন মুসলিমরা তুর্কিস্তান বিজয় করে, তখন সেখান থেকে মুসলিমরা চীনা পদ্ধতিতে কাগজ তৈরির কৌশল আয়ত্ত্ব করে। সেটাকে আরবি ভাষায় “গিরতাশ” নামে ডাকা হতো, ইরামিক ভাষায় যার প্রতিশব্দ “প্যাপিরাস”!!!

খলিফা উমর ইবনে আবদুল আজিজ একবার মদিনায় উনার নিযুক্ত গভর্নর, মুহাম্মদ বিন হাজমকে উপদেশ দেন, “তোমার কলমের শীষ চিকন রাখবে, বক্তব্য সংক্ষিপ্ত রাখবে এবং এক পাতায় তোমার লেখা শেষ করবে। অন্যথায় তুমি বায়তুল মালের আমানতের খিয়ানতকারী হিসেবে গণ্য হবে।”

আব্বাসী খলিফা হারুন-অর-রশিদের সময়(৭৮৬-৮০৯), কাগজ সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে এবং তিনি সকল দাপ্তরিক ও রাষ্ট্রীয় লেখনী শুধুমাত্র কাগজে সম্পাদন করার ফরমান জারি করেন। ৭৯৪ খ্রিস্টাব্দে দামেস্ক, ত্রিপোলি, হামা, মিশর ও বাগদাদে কাগজের কারখানা স্থাপন করা হয়। কথিত আছে যে, ইমাম আবু হানিফা(রহঃ) কাগজের প্রতি সম্মানের কারণে কখনো কাগজের দিকে পা রেখে ঘুমোতেন না।

আরও পড়ুন  বঙ্গ বা বাংলা নামের উৎপত্তি অনুসন্ধানে

ত্রয়োদশ শতাব্দীতে আন্দালুসিয়ান মুসলিমদের নিকট হতে ইউরোপীয়রা সর্বপ্রথম কাগজ সম্পর্কে ধারণা লাভ করে। ইউরোপের প্রথম কাগজ কল প্রতিষ্ঠিত হয় স্পেনের জেতিভায়।

ফরাসি ঐতিহাসিক Sedillot এর ভাষায়, “ইউরোপ কম্পাস, কাগজ, গোলাবারুদ ও আগ্নেয়াস্ত্রের ব্যবহার শিখেছে মুসলিম সভ্যতার কাছ থেকে। এগুলোই ছিল পশ্চিমা নবজাগরণের অন্যতম নিয়ামক। এর জন্য মুসলিমরা সম্মান প্রাপ্তির উপযুক্ত।”

কাগজ আবিষ্কার এবং কাগজ ব্যবহারের ইতিহাস

আব্বাসী খিলাফতের হাত ধরে বিভিন্ন মানের ও দামের কাগজের প্রচলন হয়। সবচেয়ে উন্নত মানের কাগজ তৈরি হতো সমরকন্দে, যা ক্যালিগ্রাফিতে ব্যবহার হত। সাধারণ ব্যবহারের জন্য দামেস্কের সস্তা কাগজ ব্যবহার করা হতো৷

উসমানীয় সাম্রাজ্যে বিভিন্ন কাজের জন্য বিভিন্ন রকম কাগজ ব্যবহার করা হতো। যদিও অধিকাংশ কাগজ সমরকন্দ, দামেস্ক ও ভেনিস থেকে আমদানি করা হতো। পঞ্চদশ শতাব্দীতে ইস্তাম্বুল ও বুরসায় উসমানীরা কাগজের কারখানা তৈরি করে। ১৭৪১ সালের মধ্যে ইজমির, বেইকোজ ও কাজিথান- এ কাগজের কারখানা প্রতিষ্ঠিত হয়।

১৭৯৮ সালে সর্বপ্রথম জন ডিকেনসনের হাত করে কাগজ তৈরির মেশিন আবিষ্কৃত হয়। এত মাধ্যমে কাগজ ধীরে ধীরে খুবই সহজলভ্য হতে থাকে, এবং ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়তে থাকে সারা পৃথিবীতে, আমাদের ভাব প্রকাশের বাহক হয়ে।

শেষ কথা

মানবজাতি সর্বদাই তার মনের ভাব লিপিবদ্ধ করার জন্য কোনো না কোনো উপায় খুঁজে বের করার চেষ্টা করেছে। পাতা থেকে শুরু করে পশমি কাপড়, এমনকি কাদামাটি পর্যন্ত ব্যবহৃত হয়েছে লেখার উপকরণ তৈরি করতে। কাগজ আবিষ্কারের পর থেকেই মানুষের মনের ভাব প্রকাশের নিত্য প্রয়োজনীয় বস্তুতে পরিণত হয়েছে।

শূন্য কিভাবে আবিষ্কার হলো? গণিতে শূন্যের ব্যবহার

RELATED ARTICLES

Most Popular

Related articles