Wednesday, August 10, 2022
Homeবিজ্ঞানযদি বিবর্তনের মাধ্যমে বর্তমান মানুষের সৃষ্টি হয় তবে মানুষ কি আস্তে আস্তে...

যদি বিবর্তনের মাধ্যমে বর্তমান মানুষের সৃষ্টি হয় তবে মানুষ কি আস্তে আস্তে বিবর্তিত হচ্ছে? বিবর্তনের ব্যখ্যা পার্ট- 2

বিবর্তনের মাধ্যমে বর্তমান মানুষের সৃষ্টি হয়েছে না বলে বরং বিকশিত হয়েছে বলা অধিকতর যুক্তিসঙ্গত। আপনি হয়তো সেটাই বুঝাতে চেয়েছেন।

এখন আপনার প্রশ্নের উত্তর হল – হ্যাঁ, হচ্ছে।

মানুষ সহ পৃথিবীর সকল প্রজাতিই আস্তে আস্তে বিবর্তিত হচ্ছে।

আর সেটা হচ্ছে বলেই, একই পিতা-মাতা থেকে জন্ম নিলেও আপনার DNA এবং আপনার ভাই-বোনের DNA পুরোপুরি এক নয়। এমনকি আপনার সন্তানের DNA আপনার থেকে কিছুটা হলেও আলাদা হবে। কারণ, আপনি আপনার বাবা-মায়ের থেকে যেরকম DNA পেয়েছেন, আপনার জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে সেগুলো, অত্যন্ত ক্ষুদ্র পরিসরে, বদলে যাচ্ছে।

আমাদের দেহের লোহিত রক্ত কনিকা এবং এরকম দুয়েকটি ব্যতিক্রম ছাড়া, অন্য সমস্ত কোষেই ক্রোমোজোম রয়েছে। এসব কোষের ক্রোমোজোমে থাকে আমাদের DNA। তার মধ্যে সামগ্রিকভাবে যেগুলোকে আমরা বলি দেহ-কোষ, সেই দেহ-কোষের DNA গুলো বদলে যায়, তেমনি আমাদের প্রজনন-কোষের DNA গুলোতেও এলোপাথাড়ি মিউটেশন ঘটে।

বিবর্তনে DNA এর ভূমিকা

দেহ-কোষের মিউটেশনগুলো আমাদের জন্যে যেমন উপকারী হতে পারে, তেমনি প্রচণ্ড। ক্ষতিকরও হতে পারে। তবে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই এই সামান্য পরিবর্তনগুলো আমাদের জৈবিক গুনাবলীতে তেমন কোন প্রভাব ফেলতে পারে না এবং আমাদের মৃত্যুর সাথে সাথে এসব পরিবর্তন হারিয়ে যায়।
অপর দিকে প্রজনন কোষের মিউটেশনগুলো পরবর্তী প্রজন্মে সঞ্চারিত হয়ে যায়। মোট কথা, ভ্রুনাবস্থা থেকেই তারা ওই নতুন DNA নিয়ে যাত্রা শুরু করে। একেকটি প্রজনন-কোষ অন্যটির থেকে কিঞ্চিৎ পরিমানে হলেও আলাদা। এই কারণে একই পিতা-মাতার সকল সন্তান একই রকম নয়।
অর্থাৎ আমাদের জীবদ্দশাতেই মিউটেশন ঘটে চলেছে। বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিতে, এখন পর্যন্ত আমাদের আমাদের জানামতে এটাই একমাত্র কারণ জীবের বিবর্তনের।

লক্ষ্য করলে দেখবেন, যেসকল জীব যত বেশী কৃত্রিম পরিবেশে অভ্যস্ত, তাদের নিজেদের মধ্যে চেহারার ভিন্নতা বেশী। এটা হলো ডোমেস্টিকেশন-জনিত বিবর্তন। অধিকতর প্রাকৃতিক পরিবেশে যারা বাস করে, তাদের একই প্রজাতির জীবগুলোর মধ্যে আকার আকৃতিতে ভিন্নতা কম। কিন্তু যতই প্রাকৃতিক হোক, পৃথিবীর সবখানে প্রকৃতি একরকম নয়। তাই বিবর্তন কাকে কীভাবে সুবিধা করে দেবে, কারা টিকে থাকবে সেটাও অংক কষে বলে দেয়া যায় না।

বিবর্তনের প্রবাহ আসলে একটা নদীর মত বহমান প্রক্রিয়া।

বিষয়টা এমন নয় যে, কোন এক সময় খুব দ্রুত কিছু পরিবর্তন ঘটে গিয়েছিল, তারপর একটা সময় পরিবর্তন থেমমে গেছে, আবার একটা সময় শুরু হয়ে দ্রুত কিছু পরিবর্তন ঘটিয়ে ফেলবে। বরং কখনো কিছু বেশী স্লথ আবার কখনো একটু কম স্লথ গতিতে এই পরিবর্তন ঘটেই চলেছে।

সমস্যা হলো- এসব পরিবর্তন এতটাই ধীরে ঘটে যে, সেগুলো আমাদের নজরে পড়ে না। কতগুলো উদাহরণ দিলে বুঝতে সুবিধা হবে। সবগুলো উদাহরণ আপনারা মন-প্রাণ দিয়ে উপলব্ধি করতে চেষ্টা করবেন।

আপনারা জানেন যে, একটি ঘড়ির মিনিট সেকেন্ডের কাঁটার মতোই, ঘণ্টার কাঁটাটিও সর্বক্ষণ চলছে। কিন্তু আমরা সেটা সরাসরি টের পাই না। সারাক্ষণ ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বসে থাকলে কিছুই টের পাবেন না। অথচ আপনি যদি ১০ থেকে ১৫ মিনিটের ব্যবধানে ঘণ্টার কাঁটা সহ ঘড়ির ডায়ালের ছবি তুলে নেন। তারপর সেই ছবিগুলো একসাথে মেলানোর চেষ্টা করেন, তাহলে ঘণ্টার কাঁটার অবস্থানে কিছুটা পরিবর্তন দৃশ্যমান হবে।
বিবর্তনের বিষয়টা ঘড়ির ঘণ্টার কাঁটার থেকেও শত-শত গুন ধীরে ঘটছে। তাই আমরা সরাসরি কিছুই বুঝতে পারছি না। কিন্তু ৩০, ৪০, ৫০ হাজার বছর বা লক্ষ বছরের ব্যবধানে একই পরম্পরার বংশধরদের জৈবিক গুনাবলীর তুলনা করলে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন লক্ষ্য করবো।

বিবর্তনবাদকে সব সময় বাস্তব পরিবেশের সাহিত খাপ খায় মনে হবে, যদি সময়কেই বিবর্তনের নাম দিয়ে দেন। আমরা জানি সময়ের সাথে সব কিছুই পরিবর্তীত হয়, এবং পূর্ববর্তী সময়ের প্রভাব পরবর্তী সময়ে দেখা যায়। অর্থ্যাত, বিবর্তন বলে কোন মতবাদ নেই, সময়ের আরেক নাম বিবর্তন দিয়ে দিলে সব কিছুই বিবর্তনের সাহিত মিলে বলেই বোধদয় হবে।

পৃথিবীতে প্রতিবছর ঋতুর আবর্তন ঘটে। এর ফলে বৃক্ষের শরীরে যেমন সারি পড়ে, তেমনি মাটিতেও আস্তরন পড়ে। সেই মাটিই একসময় কঠিন শিলায় পরিনত হয়। তার ফলে একেক যুগের জীবদের দেহাবশেষ শিলাপাথরের একেক স্তরে জমা পড়ে থাকে। অনেকটা সেই ১০-১৫ মিনিটের ব্যবধানে ঘণ্টার কাঁটার ছবি তোলার মতো। এই বিষয়ের উপর ইন্টারনেটে অসংখ্য তথ্য-চিত্র রয়েছে। আপনারা দেখে নিয়ে পারেন। তাতে করে আপনারা বুঝতে পারবেন যে, এখানে কোথাও কোন সন্দেহের সুযোগ নেই। কোথাও এতটুকু ব্যতিক্রম নেই। যুগের সাথে জীবের বিবর্তনের এই লক্ষ-কোটি বছরের ইতিহাস লেখা রয়েছে পৃথিবীর বুকে। ধীর পরিবর্তন বোঝার জন্যে ফটোগ্রাফিক ক্যামেরা-ই একমাত্র ব্যবস্থা নয়।

আরও পড়ুন  বিজ্ঞানের 25 আবিষ্কার এবং আবিষ্কারকের নাম

আমরা ইউরেনাস আর নেপচুনকে কিভাবে খুঁজে পেয়েছি জানেন?

কিভাবে বুঝতে পেরেছি যে এরা আর অন্যসব তারাদের মত দুর আকাশের তারা নয়। বরং এরা আমাদের প্রতিবেশী। এই কথাটুকু বুঝতে গিয়ে রাতের পর রাত জেগে এদের ছবি তোলা হয়েছে। তারপর সেসব ছবি মিলিয়ে দেখা গেছে, অন্যসব তারাদের থেকে এদের চাল-চলন ভিন্ন। এদের চলার গতি এতটাই ধীর যে, সারাজীবন মাথা কুটে মরলেও, তুলনামূলক বিশ্লেষন ছাড়া এদের এই অদ্ভূত আচরন ধরা পড়তো না।

মহান আল্লাহ পাক, “কুন” বললেই হয়ে যায়। প্রভুর হুকুমে কিছু ঘটে গেলে যদি আমরা খুজতে চাই, কি পাবো? তখন হয়ত মনে হবে, এমনি এমনিই হয়ে গিয়েছে, বা বিবর্তন, বিগব্যাং ইত্যাদির ফলে হয়ে গিয়েছে। যদিও তা মহান আল্লাহ পাকের হুকুমে হয়েছে।

ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বালুকার কনা যেমন বিশাল মহাদেশ গড়ে তোলে, তেমনি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পরিবর্তন অনেক দীর্ঘ সময়ের ব্যবধানে বড় পরিবর্তনের ভিত্তি হয়। আমাদের এক প্রজন্মের অভিজ্ঞতা, আর এক জীবনের জ্ঞান, এসব পরিবর্তন উপলব্ধি করার পক্ষে অত্যন্ত কম সময়।

যেমন ধরুন, আমাদের সূর্য যে প্রতি মুহূর্তে শক্তির বিকিরণের মাধ্যমে ভর হারাচ্ছে, আর তার কারণে আমাদের পৃথিবী প্রতি মুহূর্তে একটু করে দুরে সরে যাচ্ছে। একই সাথে আবার সূর্যের আকার বাড়ছে, উত্তাপ বাড়ছে। আগামী ৫০০ কোটি বছর ধরে এরকম বাড়তেই থাকবে এবং একসময় সূর্যটা এত বড় হবে যে পুরো আকাশ জুড়ে হবে তার রাজত্ব। এটা হঠাৎ করে একদিনে হবে না। কিন্তু ৫০০ কোটি বছরে এরকম হতে গেলে আজ এই মুহূর্তে যা ঘটা দরকার, তা কিন্তু ঠিকই ঘটছে। এখন আপনিই বলুন, এসব পরিবর্তন কি আমরা খালি চোখে তো দুরের কথা, আমাদের আবিষ্কৃত সুক্ষ্ম যন্ত্রপাতি দিয়েও কি বুঝতে পারি?
মনে করুন আপনি কোন একটা ব্যাংকে ১% বাৎসরিক সূদে ১০০ টাকা জমা রাখলেন। ফলে বছর শেষে সূদে-আসলে আপনার অ্যাকাউন্টে ১০১ টাকা হবে। এরকম করে ৭০ বছরে হয়ত সেখানে ১৭০-১৮০ টাকা হবে। এটা একটা দৃশ্যমান পরিবর্তন।

আরও পড়ুন  যদি মানুষ বানরের বিবর্তনের মাধ্যমে সৃষ্টি হয়, তাহলে সমস্ত বানর কেন মানুষ হলো না? Part 1

কিন্তু ভেবে দেখুন, সূদের হার যদি ০.০০০০০০১% বা এরকম অতিক্ষুদ্র কোন সংখ্যা হতো, তাহলে কী হতো? এক বছরের শেষে আপনি কী দেখতেন? ১০০ বছর পরেই বা কী দেখতেন?

এক বছর শেষে আপনার মনে হতো, আপনার সেই একশ টাকা একশ টাকাই রয়েছে।
একশ বছর পরেও দেখতেন, সেই একশ টাকার সাথে একটা পয়সাও যুক্ত হয়নি।
অথচ প্রতি বছরেই কিন্তু কিছু না কিছু সূদ যোগ হচ্ছে আপনার অ্যাকাউন্টে। আর সেটা হচ্ছে বলেই লক্ষ বছরের ব্যবধানে আপনি ১০ পয়সার মতো মুনাফা পাবেন। এই ১০টি পয়সা হঠাৎ করে আপনার অ্যাকাউন্টে এসে পড়েনি। বরং প্রতি বছর কিছু কিছু করে জমেছে।

মনে করে দেখুন, আজ থেকে মাত্র ১০০০ বছর আগে এই দেশের মানুষ কেউ কিন্তু বাংলায় কথা বলত না। বাংলা ভাষা তখনও তার বর্তমানের গঠন পায়নি। তাই বলে আমাদের পূর্বপুরুষরা যে বিদেশি ভাষায় কথা বলতেন, এমন না। তাঁরাও দেশি ভাষাতেই বলতেন। কিন্তু আজকের বাংলা ভাষার সাথে তুলনা করলে দেখা যাবে সেটা আসলে অন্য একটা ভাষা ছিল।
তাহলে বিষয়টা কী দাঁড়াল? হঠাৎ করে কি সবাই একদিন সেই মধ্যযুগীয় ভাষাটি ভুলে গেছে আর বাংলায় কথা বলতে শুরু করেছে? মোটেই না। নিজের জীবনের ব্যপ্তিতেই এর উত্তর পেয়ে যাবেন। অন্তত গত ২০০ বছরের বাংলা সাহিত্য পড়ুন। এই ১০০ বছর আগেও অনেক শব্দ ছিল, উচ্চারন ভঙ্গি ছিল, অভিব্যক্তি ছিল, যেগুলো এখন বদলে গিয়েছে। কাল-ভেদে, স্থান-ভেদে, প্রয়োজন-ভেদে সবকিছুই এভাবে পাল্টে যায়।

উন্নত প্রজাতির জৈবিক বিবর্তন আরো অনেক ধীরে ঘটে। আর, জীবের DNA তে এলোপাথাড়ি মিউটেশনের ব্যাপারটি যেহেতু ব্যবহারিক পর্যায়ে পরিক্ষিত ও প্রণানিত, আর যেহেতু DNA গুলোই জিনের বাহক, আর জিনগুলোই জৈবিক গুনাগুন নির্ধারন করে, তাই DNA এর মিউটেশনের ফলে জীবদেহের বিবর্তন হতে বাধ্য।

আমরা আরেকটা জিনিস যেটা বুঝতে পারি না, সেটা হল এক লক্ষ বছর আসলে কতটা দীর্ঘ সময়। আর কোটি বছরের কথা তো বাদই দিলাম। আমরা সকলেই জানি ১ লক্ষ মানে হল ১০০ হাজার, তাই না?

তাহলে ১ লক্ষ বছরের তুলনায় ১.০১ লক্ষ বছর মনে হতে পারে সামান্য একটু বেশি। কিন্তু আসলেই কি সামান্য? চলুন হিসেব করে ফেলি।
১ লক্ষ মানে যদি হয় ১০০ হাজার, তাহলে ০.০১ লক্ষ মানে ১ হাজার বছর। ভেবে দেখুন ১ হাজার বছর আগে পৃথিবীতে কোন মোটরযান ছিল না, বাষ্প-ইঞ্জিন ছিল না, বহুতল বাড়ি ছিল না, মহাসড়ক ছিল না, রেললাইন ছিল না, রোলার-কোস্টার ছিল না। তখন কেউ কল্পনাও করেনি যে মানুষ একদিন মঙ্গলে গবেষনাগার বানাবে। তখন এই দেশের বেশিরভাগ মানুষ গাছতলায় ছনের ঘরে থাকতো। আর পরিধান করতো এক প্রস্থ তাতে বোনা কাপড়। আর তারা যে ভাষায় কথা বলতো, সেটি আমরা এখন বুঝতে পারবো না।

মাত্র ১০০০ বছর আসলে আমাদের হিসেবে অনেক সময়। আমরা যদি ১০০০ জন মহান ব্যক্তির নাম লিখি, তার মধ্যে দেখা যাবে ৯৫০ জনেরই জন্ম হয়নি ১০০০ বছর আগে।

এখন এক হাজারের সাথে বড়জোর হয়তো দুই হাজারের তুলনা চলে। না হয় আরও এক হাজার পিছিয়ে তিন হাজার করলাম। এর আগেও পৃথিবীতে মানুষ ছিল। যাদের তেমন কারো নামই আমরা সঠিকভাবে জানি না।

আরও পড়ুন  বিজ্ঞানের 25 আবিষ্কার এবং আবিষ্কারকের নাম

পাঁচ হাজার বছর আগে মানুষ একটু একটু লিখতে শিখেছে। দশ হাজার বছর আগে কৃষিকাজ করে উদ্বৃত্ত ফসল ফলাতে শিখেছে। তখনও মানুষ ছিল আমাদের মতোই দেখতে।

বড় পরিবর্তন একবার হয়েছে এক লক্ষ থেকে সত্তুর হাজার বছর আগে পর্যন্ত। যখন মানুষ রূপকথার গল্প বানাতে শিখেছে।

তারও লক্ষ বছর আগে প্রায় কয়েক লক্ষ বছর ধরে আমরা দুইপায়ে হাঁটতে শিখেছি। দুই হাতের বহুবিধ ব্যবহার শিখেছি। দুই পায়ে হাটার সুবিধাগুলো নিয়েছি, কিন্তু অসুবিধাগুলো আজও পুরোপুরি কাটিয়ে উঠতে পারিনি।

বুঝে দেখুন ব্যাপারটা। আজ থেকে ২৫ লক্ষ বছর আগে পৃথিবীতে আমাদের মত মানুষ ছিল না। কিন্তু কাছাকাছি গঠনের এমন প্রজাতি ছিল যার থেকে লক্ষ লক্ষ বছর লেগেছে আমাদের বর্তমান চেহারা পেতে।

এরকম আরও চারটি ২৫ লক্ষ হলে হবে ১ কোটি। আর ২৫ কোটি বছর আগে ছিল ডাইনোসরের রাজত্ব। ৪৫০ কোটি বছর আগে পৃথিবী ছিল একটা এবড়ো থেবড়ো গঠনের ফুটন্ত অগ্নি-পিণ্ড। আমাদের মাত্র এক পুরুষে যা ঘটে, সেটাকে যদি টেনে টেনে ১০ হাজার পুরুষ পিছনে গেলে দেখবেন তারা অন্যকিছু ছিল। এই ১০ হাজার পুরুষের সকলেই ছিল তাদের পিতা-মাতার থেকে আগত, একই রকম দেখতে, প্রায় একই জৈবিক বৈশিষ্টের অধিকারী।

প্রকৃতি আসলে এত বেশি জটিল আর বিস্তৃত বিষয় যে, ঠিক কখন কিসের প্রভাবে DNA মিউটেশন ঘটে, তার সব কথা আমরা এখনও জানি না। মিউটেশন মানে হলো কপি করতে যেয়ে ভুল হওয়া। নিশ্চিতভাবেই এটা আমাদের নিয়তি। তবে আধুনিক বিজ্ঞানের যুগে জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং করে মানুষ ইচ্ছাকৃতভাবে নিয়ন্ত্রিত উপায়েও মিউটেশন ঘটিয়ে নতুন নতুন জাতের উদ্ভব ঘটাচ্ছে।

এর আগেও যখন থেকে মানুষ পশুপালন শিখেছে, সেই পশুদের খাদ্যাভ্যাস বদলে গেছে। যখন থেকে কৃষিকাজ শিখেছে, তখন তার সমাজ-ব্যবস্থা এবং পরিশ্রমের ধরন বদলে গেছে। যখন থেকে পুড়িয়ে খেতে শিখেছে, তখন থেকে দেহের বেশিরভাগ শক্তি পরিপাকতন্ত্রের কাজ করা বাদ দিয়ে মগজের কাজে নিয়জিত হয়েছে। পশুপাখি আর খাদ্যশষ্যকে বস মানাতে যেয়ে নিজেই হয়ে গেছে গৃহবাসী সম্প্রদায়। এরকম বহুরকম পরোক্ষ জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং মানুষ বহুকাল ধরেই করে আসছে। মানুষের হাতে বহু প্রজাতি বদলে গেছে। মানুষ নিজেও বদলে যাচ্ছে। প্রতিনিয়ত ঘটে চলেছে এই পরিবর্তন।

প্রকৃতিতে যা ঘটা সম্ভব সেটা ঘটবে। কোন কোন পরিবর্তন দেখিয়ে দেবে ধ্বংশের পথ, আর কোনটা সাহায্য করবে টিকে থাকতে। একই পূর্বপুরুষ থেকে উৎপন্ন হয়েও এশিয়া, ইউরোপ আর অস্ট্রেলিয়ার মানুষের মধ্যে রয়েছে অনেক ব্যবধান। কারণ, বহুযুগ ধরে তাদের মধ্যে DNA বিনিময় ঘটেনি। আমেরিকায় মানুষ গিয়েছে মাত্র ১০-১২ হাজার বছর আগে। তাদের আদিবাসীরা অনেক আলাদা আমাদের থেকে। তবুও এখনও সবাই মানুষ। কিন্তু লক্ষ লক্ষ বছর ধরে ভৌগলিক বিচ্ছিন্নতার কারণে ব্যবধান বাড়তে থাকলে, একসময় তারা এত বেশী অচেনা হয়ে পড়ে যে, তারা তখন আর পরস্পরের প্রতি আকৃষ্ট হয় না। সেটা হয়ে যায় DNA বিনিময়ের পথে আরও বড় বাধা। তারপর পাশাপাশি বাস করলেও তাদের মধ্যে শুধু ব্যবধানই বাড়তে থাকে। এভাবেই উদ্ভব হয় ভিন্ন প্রজাতির, যারা একটা সময় পর্যন্ত একই ছিল।

সেই পরিবর্তন থামানোর মতো প্রযুক্তি আমাদের হাতে নেই। বিবর্তন ঘটে চলাটাই স্বাভাবিক। থেমে যাওয়াটা অস্বাভাবিক। তাই অবধারিতভাবেই এটা ঘটে চলেছে। বর্তমানে তো চলেছেই, আগামীতে চলবে।

RELATED ARTICLES

Most Popular

Related articles